জামদানি: ঢাকার চিরন্তন ঐতিহ্য

বর্তমানে জামদানি নানা স্থানে বুনন করা হয়, কিন্তু ঢাকাকেই জামদানির আদি জন্মস্থান বলে বিবেচনা করা হয়। জামদানি বয়নের অতুলনীয় পদ্ধতি ইউনেস্কো কর্তৃক একটি অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
১৭ নভেম্বর, ২০১৬ সালে দেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় বাংলাদেশের জামদানি।
ঢাকাই মসলিনের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি অতি পরিচিত। মসলিনের উপর নকশা করে জামদানি তৈরি হতো। জামদানি বলতে সাধারণত‍ শাড়িকেই বোঝান হলেও জামদানি নকশী ওড়না, কুর্তা, শার্ট, ব্লেজার, পাঞ্জাবি, পর্দা বিভিন্নভাবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

“১৭০০ শতাব্দীতে জামদানি দিয়ে নকশাওয়ালা শেরওয়ানির প্রচলন ছিল। এছাড়া, মুঘল ও নেপালের আঞ্চলিক পোশাক রাঙ্গার জন্যও জামদানি কাপড় ব্যবহৃত হত।”

এবার আসি জামদানির নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মতবাদের আলোচনায়। একটি মত অনুসারে ‘জামদানি’ শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে এসেছে। ফার্সি জামা অর্থ কাপড় এবং দানা অর্থ বুটি, সে অর্থে জামদানি অর্থ বুটিদার কাপড়। একারণে মনে করা হয় মুসলমানেরাই ভারত উপমহাদেশে জামদানির প্রচলন ও বিস্তার করেন। আরেকটি মতে, ফারসিতে জাম অর্থ এক ধরনের উৎকৃষ্ট মদ এবং দানি অর্থ পেয়ালা। জাম পরিবেশনকারী ইরানি সাকীর পরনের মসলিন থেকে জামদানি নামের উৎপত্তি ঘটেছে।

জামদানির প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায়, আনুমানিক ৩০০ খ্রিস্টাব্দে কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থে, ‘পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সি’ বইতে এবং বিভিন্ন আরব, চীন ও ইতালির পর্যটক ও ব্যবসায়ীর বর্ণনাতে। কৌটিল্যের বইতে বঙ্গ ও পুন্ড্র এলাকায় সূক্ষ্ম বস্ত্রের উল্লেখ আছে, যার মধ্যে ছিল ক্ষৌম, দুকূল, পত্রোর্ণ ও কার্পাসী।

নবম শতাব্দীতে আরব ভূগোলবিদ সোলায়মান তার গ্রন্থ ‘স্রিল সিলাই-উত-তওয়ারিখে’ রুমি নামের রাজ্যে সূক্ষ্ম সুতি কাপড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার বর্ণনা অনুসারে বোঝা যায়, রুমি রাজ্যটি আসলে বর্তমানের বাংলাদেশ। চতুর্দশ শতাব্দীতে বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলাদেশ পরিভ্রমণ করেন এবং সোনারগাঁও এলাকাস্থিত সুতিবস্ত্রের প্রশংসা করেছেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে ইংরেজ পর্যটক র‌্যালফ ফিচ ও ঐতিহাসিক আবুল ফজলও ঢাকার মসলিনের প্রশংসা করেছেন।
আরেক ঐতিহাসিক টেলরের জামদানির বর্ণনা দিয়েছেন। তার বর্ণনানুসারে সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ১০*২ হাত মাপের ও ৫ শিক্কা ওজনের একটুকরা আব-ই-রওয়ান এর দাম ছিল ৪০০ টাকা। সম্রাট আওরঙ্গজেবের জন্য তৈরি জামদানির দাম ছিল ২৫০ টাকা। ১৭৭৬ সাল পর্যন্ত ঢাকায় সবচেয়ে উৎকৃষ্টমানের জামদানির মূল্য ছিল ৪৫০ টাকা।

জামদানি শাড়ির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সূক্ষ্ম নকশা এবং কারুকার্য। এই শাড়ি তৈরি করতে অনেক সময় এবং ধৈর্য্যের প্রয়োজন হয়। জামদানি শাড়িতে সাধারণত ফুল, লতাপাতা, এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কল্কা, ফুল, লতাপাতা, ময়ূর, হাঁস, মাছ, তারা, ইত্যাদি।
নকশা অনুযায়ী জামদানীর নানা নাম হয়ে থাকে যেমন তেরছা, জলপাড়, পান্না হাজার, করোলা, দুবলাজাল, সাবুরগা, বলিহার, শাপলা ফুল, আঙ্গুরলতা, ময়ূরপ্যাচপাড়, বাঘনলি, কলমিলতা, চন্দ্রপাড়, ঝুমকা, বুটিদার, ঝালর, ময়ূরপাখা, পুইলতা, কল্কাপাড়, কচুপাতা, প্রজাপতি, জুঁইবুটি, হংসবলাকা, শবনম, ঝুমকা, জবাফুল ইত্যাদি।

ঢাকা জেলার সোনারগাঁও, ধামরাই, তিতাবাড়ি, বাজিতপুর, জঙ্গলবাড়ি প্রভৃতি এলাকা মসলিনের জন্য সুবিখ্যাত ছিল। ইউরোপীয়, ইরানী, আর্মেনীয়, মুঘল, পাঠান প্রভৃতি বণিকেরা মসলিন ও জামদানি ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত ছিলেন। এ কারণে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানেরাও এই শিল্প বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন।

ঢাকাই মসলিনের স্বর্ণযুগ বলা হয় মুঘল আমলকে। এ সময় দেশে-বিদেশে মসলিন, জামদানির চাহিদা বাড়তে থাকে এবং শিল্পেরও ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। তৎকালীন ঢাকা থেকে প্রায় একলক্ষ টাকা মূল্যমানের মলমল-খাস (মসলিন, জামদানি) মোঘল দরবারে রপ্তানি করা হত।
১৭৪৭ সালের হিসাব অনুযায়ী দিল্লীর বাদশাহ, বাংলার নবাব ও জগৎ শেঠের জন্য প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার জামদানি কেনা হয়। এছাড়া ইউরোপীয় ব্যবসায়ীগণ প্রায় নয় লাখ টাকার মসলিন কেনে।
তবে আঠারো শতাব্দীর শেষের দিকে মসলিন রপ্তানি অনেকাংশে হ্রাস পায়। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে। এদের নিযুক্ত গোমস্তারা নিজেদের স্বার্থে তাঁতিদের উপর নির্যাতন শুরু করে। তাঁতিরা কম মূল্যে কাপড় বিক্রি করতে রাজি না হলে তাদের মারধোর করা হতো।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা পাবার পরে ঢাকার ডেমরায় জামদানি পল্লীর তাঁতিদের আর্থিক সাহায্য দেয়া হয়।তবে পারিশ্রমিক,বিভিন্ন কলকারখানা ও ব্যাটারিচালিত গাড়ি হওয়ার কারণে তাঁতিরা আর এ পেশায় আসতে চাইছেন না।

বর্তমান বাজারে জামদানির উচ্চমূল্য ও বিপুল চাহিদার কারণে বাংলাদেশের এই শিল্পে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। তবে এই শ্রম নিবিড় হস্তশিল্পে উপযুক্ত মজুরি মেশিন বোনা শাড়ির তুলনার বেশি, কিন্তু তাঁতিরা পর্যাপ্ত মজুরি পায় না বলে এই পেশা দক্ষ তাঁতি দিন দিন কমে যাচ্ছে।
জামদানি শাড়ির আগের সব বিখ্যাত ও অবিস্মরণীয় নকশা ও বুননের অনেকগুলোই বর্তমানে বিলুপ্ত। কারণ এগুলো বুনতে সময় বেশি লাগে যার জন্য মজুরিও বেশি।
নবীন কারিগররা তাই হালকা নকশা করে শাড়ির দাম কিছুটা কমিয়ে আনেন।

জামদানি শাড়ি অনেক প্রকার হয়। তবে প্রাথমিক ভাবে উপাদান অনুযায়ী এটি তিন প্রকার।
হাফ সিল্ক জামদানি – যার আড়াআড়ি সুতাগুলো হয় তুলার আর লম্বালম্বি সুতাগুলো হয় রেশমের।
ফুল কটন জামদানি- যা সম্পূর্ণ তুলার সুতায় তৈরি।
ফুল সিল্ক জামদানি – যা সম্পূর্ণ রেশমের সুতায় তৈরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart
Select your currency